ড. অমর্ত্য সেন (জন্ম ৩ নভেম্বর ১৯৩৩ (বয়স ৮৩)


অমর্ত্য সেন (জন্ম ৩রা নভেম্বর, ১৯৩৩) একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ভারতীয় বাঙালী অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক। দুর্ভিক্ষ, মানব উন্নয়ন তত্ত্ব, জনকল্যাণ অর্থনীতি ও গণদারিদ্রের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ বিষয়ে গবেষণা এবং উদারনৈতিক রাজনীতিতে অবদান রাখার জন্য ১৯৯৮ সালে তিনি অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে ব্যাংক অফ সুইডেন পুরস্কার (যা অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার হিসেবে পরিচিত) লাভ করেন। অমর্ত্য সেনই জাতিসংঘের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা এবং মানব সম্পদ উন্নয়ন সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য মানব উন্নয়ন সূচক আবিষ্কার করেন। তিনিই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক না হয়েও ন্যাশনাল হিউম্যানিটিস মেডালে ভূষিত হন।
তিনি বর্তমানে টমাস ডাব্লিউ ল্যামন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক অধ্যাপক এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত আছেন। তিনি হার্ভার্ড সোসাইটি অফ ফেলোস, ট্রিনিট্রি কলেজ, অক্সব্রিজ এবং ক্যামব্রিজের একজন সিনিয়র ফেলো। এছাড়াও তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের মাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হেলথ ইমপ্যাক্ট ফান্ডের অ্যাডভাইজরি বোর্ড অফ ইনসেন্টিভ ফর গ্লোবাল হেল্থ্ এর সদস্য। তিনিই প্রথম ভারতীয় শিক্ষাবিদ যিনি একটি অক্সব্রিজ কলেজের প্রধান হন। এছাড়াও তিনি প্রস্তাবিত নালন্দা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবেও কাজ করেছেন।



অমর্ত্য সেনের লিখিত বই বিগত চল্লিশ বছর ধরে প্রায় তিরিশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি ইকনমিস্ট ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটির একজন ট্রাষ্টি। ২০০৬ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাকে অনূর্ধ ষাট বছর বয়সী ভারতীয় বীর হিসেবে চিহ্নিত করেছে[৭] এবং ২০১০ সালে তাঁকে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান দেওয়া হয়। নিউ স্টেট্সম্যান ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের ৫০ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান দেয়।
শৈশবঃ
অমর্ত্য সেনের জন্ম বাংলাদেশের মানিকগঞ্জে। তাঁর আদি নিবাস বর্তমান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ওয়ারীতে। কথিত আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁঁর নাম রেখেছিলেন অমর্ত্য, যার অর্থ অমর বা অবিনশ্বর। অমর্ত্য সেন একটি সম্ভ্রান্ত বৈদ্য পরিবারে জন্মগ্রহন করেছিলেন। তাঁর মাতামহ আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের একজন পন্ডিত এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহযোগী। এছাড়া, তিনি সংস্কৃত ভাষার অধ্যাপক এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপাচার্যও ছিলেন। ক্ষিতিমোহন সেনের তিন ভ্রাতষ্পুত্রের মধ্যে সুকুমার সেন ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার, অমিয় সেন একজন প্রসিদ্ধ ডাক্তার এবং ব্যারিস্টার অশোক কুমার সেন, সাংসদ. ছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় আইন ও বিচার মন্ত্রনালয়ের একজন সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রি। অমর্ত্য সেনের বাবা অধ্যাপক আশুতোষ সেন এবং মা অমিতা সেন, দুজনই ঢাকার মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহন করেন। আশুতোষ সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং পরবর্তীকালে ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দিল্লিতে কর্মরত ছিলেন।


শিক্ষাজীবনঃ
১৯৪১ সালে অমর্ত্য সেন তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেন সেইন্ট গ্রেগরী উচ্চ বিদ্যালয় এ। দেশ ভাগের পরে তাঁরা ভারতে চলে এলে, অমর্ত্য সেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ওই বছরই তিনি ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে পড়তে যান। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রথম শ্রেণীতে বি.এ (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই বছরই তিনি ক্যামব্রিজ মজলিসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি ট্রিনিট্রি কলেজে স্নাতকের ছাত্র থাকা অবস্থাতেই ব্রিটিশ রয়্যাল সোসাইটির ফেলো প্রশান্ত চন্দ্র মহলনাবিশের সাথে দেখা করেন। তিনি অমর্ত্য সেনের সাথে মিলিত হয়ে অভিভূত হন এবং পরবর্তীকালে কলকাতা ফিরে এসে তৎলালীন পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রি ত্রিগুনা সেনের কাছে অমর্ত্য সেনের জন্য সুপারিশ করেন। ত্রিগুনা সেন তখন জাতীয় কাউন্সিলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছিলেন।
ক্যামব্রিজের টিনিট্রি কলেজে পি.এইচ.ডি ডিগ্রির জন্য ভর্তি হয়ে দুই বছরের ছুটিতে কলকাতা ফিরলে সাথে সাথে ত্রিগুনা সেন তাকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং অর্থনিতী বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান হিসেবে নিয়োগ করেন। অমর্ত্য সেনই ছিলেন ভারতের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ (২৩ বছর) অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালীন তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং তাত্বিক এ.কে. দাশগুপ্তকে তার অধীক্ষক (সুপারভাইজার) হিসেবে পেয়েছিলেন। পূর্ণ দুই বছর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার পর ১৯৫৯ সালে তিনি ট্রিনিট্রি কলেজে তার পি.এইচ.ডি ডিগ্রি শেষ করার জন্য ফিরে যন।


ট্রিনিট্রিতে ফেরত যাবার পর তিনি সেখানে ফেলোশিপ অর্জন করেন যা তাঁঁকে পরবর্তী চার বছর তাঁর ইচ্ছামত যে কোন কাজ করার সুযোগ এনে দেয়। তিনি দর্শনশাস্ত্রে অধ্যয়ন করার সিদ্ধান্ত নেন। দর্শনশাস্ত্রের জ্ঞান তাঁকে পরবর্তীকালে তাঁর গবেষণা কাজে অনেক সাহায্য করে। তাঁর মতে
যদিও দর্শনের প্রতি তাঁর এই আগ্রহ অনেক আগেই তাঁর কলেজ জীবন থেকে শুরু হয়েছিল। প্রেসিডেন্সি কলেজে তিনি নিয়মিত দর্শন চর্চা এবং এর উপর বিতর্কে অংশগ্রহন করতেন।
অমর্ত্য সেনের জন্য কেমব্রিজ একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিনত হয়েছিল। সেখানে কেইনসিয়ান অর্থনিতীর পক্ষাবলম্বি ও কেইনসের অবদান সমর্থনকারীদের সাথে নিও-ক্লাসিক্যাল ও কেইনসের বিরোধিদের সাথে বিতর্ক লেগেই থাকত। সৌভাগ্যবশত অমর্ত্য সেনের সাথে দুই পক্ষের সম্পর্কই ভাল ছিল এবং ট্রিনিট্রি কলেজে সহনশীল এবং গনতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকত। বি.এ শেষ করার পর পি.এইচ.ডি গবেষণার জন্য অমর্ত্য সেনকে সম্পূর্ন ভিন্নধর্মী একটি বিষয়ের চয়ন করতে হয়। তিনি জন রবিনসনের অধীনে অর্থনিতীর বিকল্প কৌশলের উপর তাঁর গবেষণাপত্র দাখিল করেন।জন রবিনসন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী কিন্তু কিছুটা অসহনশীল এবং নব্য-কেইনসিয়ান ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন। কুয়েন্টিন স্কিনারের মতে অমর্ত্য সেন কেমব্রিজ অ্যাপোস্টলস নামক একটি গোপন সংঘের সদস্য ছিলেন।

শিক্ষকতাঃ
অমর্ত্য সেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এর অর্থনীতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা এবং পূর্ণ অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৬০-৬১ সালে ম্যাসাচুসেট্‌স ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাট বার্কলেতে ভিজিটিং অধ্যাপক ছিলেন। বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত। তিনি ১৯৭২ সালে তিনি লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এ অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। অমর্ত্য সেনের লেখা গ্রন্থাবলী ৩০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।



Share on Google Plus

About মানিকগঞ্জ বার্তা

0 comments:

Post a Comment